শুভ কল্যাণ বিশ্বাস, এবার বাংলা, নদীয়া -
নদিয়া জেলাতে ২০২১ এর তুলনায় ২০২৬-এ বিধানসভা ভোটে বিজেপির ফলাফল ভালো হতে পারে । তার অবশ্য একাধিক কারণ আছে।
২০২১ এর দুর্নীতি ইস্যু থাকলেও লক্ষীর ভান্ডার এই ইস্যুকে ধামাচাপা দিতে সক্ষম হয়েছিল। কিন্তু ২০২৬ এ কোন লক্ষী ভান্ডার বর্তমান সময়ে রাজ্য সরকারকে আর বাঁচাতে পারবে না।
এই জেলার মধ্যে ১৭ টা বিধানসভা আসন। যার মধ্যে ৫টি সংরক্ষিত।
২০২১ সালে এই জেলাতে মোট ভোটার ছিল ৪১ লক্ষ ১২ হাজার ০৬৮ জন।
মোট ভোট পোলিং হয়েছিল ৩৬ লক্ষ ২৫ হাজার ২৫৮ জনের। শতাংশের হিসেবে ৮৮. ২% শতাংশ।
শাসক দল তৃণমূল এখানে ভোট পেয়েছিল মোট ১৬ লক্ষ ১১ হাজার ৫০ জনের। যেটা মোট পোলিং ভোটের ৪৪.৪ শতাংশ।
বিরোধী বিজেপি পেয়েছিল ১৫ লক্ষ ৯০ হাজার ১৪৭ জনের। যেটা মোট পোলিং ভোটের ৪৩.৯ শতাংশ। অর্থাৎ তৃণমূলের সঙ্গে বিজেপির ভোটের পার্থক্য ছিল ০.৫% মাত্র।
এই ছোট্ট একটি পরিসংখ্যান থেকেই বোঝা যায় এখানে বিজেপির আসন সংখ্যা কম থাকলেও ভোটের পার্থক্য খুবই কম ছিল।
অপরদিকে সিপিএম ২০২১ সালে ভোট পেয়েছিল ২ লক্ষ ৮ হাজার ৬৯৯ জনের। যেটা মোট পোলিং ভোটের ৫.৮%।
আর কংগ্রেস পেয়েছিল ৫৬ হাজার ৬৭৬ ভোট। অর্থাৎ ১.৬ শতাংশ।
তৃণমূল বিজেপি একে অপরের ঘাড়ে নিশ্বাস ফেলছে।
বর্তমানে বিজেপির দখলের সাতটি বিধানসভা ও তৃণমূলের দখলে দশটি বিধানসভা। দুটি লোকসভা আসন কৃষ্ণনগর তৃণমূলের দখলে রানাঘাট বিজেপির দখলে।
অর্থাৎ নদীয়া জেলায় বিজেপি তৃণমূল জোর টক্কর হতে যাচ্ছে ২০২৬ শে।
তৃণমূলের দখলে থাকা ১০ টি বিধানসভা আসনের মধ্যে কমপক্ষে বিজেপির দখলে ৪টি আসতে পারে। সেগুলি হল কৃষ্ণনগর দক্ষিণ, তেহট্ট, রানাঘাট দক্ষিণ, নাকাশিপাড়া।
এছাড়া নবদ্বীপ শান্তিপুর ও পলাশীপাড়া ও করিমপুর বিধানসভা এখানেও জোর লড়াই হওয়ার সম্ভাবনা আছে। যদি বিজেপি ঠিক ঠাক প্রার্থী নির্বাচন করতে পারে, ভোটের দিন সমস্ত বুথ গুলোতে বিজেপি কর্মী বসাতে পারে ও গণনা কেন্দ্র সঠিকভাবে পাহারা দিয়ে ভোট গুনে বাইরে আসতে পারে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতামত অনুযায়ী,SIR হলে তৃণমূলের চার থেকে পাঁচ শতাংশ ভোট কমে যেতে পারে। CAA ফর্ম ফিলাপের কারণে বিজেপির দুই থেকে তিন শতাংশ ভোট বৃদ্ধি পেতে পারে।
অর্থাৎ এই জেলায় বিজেপির জয়ের সম্ভাবনা প্রবল।
কৃষ্ণনগর উত্তর বিধানসভায় যে নামটি প্রথমেই উঠে আসছেন তিনি হলেন রানী মা অমৃতা রায়। তিনি লোকসভা ভোটে কৃষ্ণনগরের প্রার্থী ছিলেন।
এছাড়া আরো দুই একজনের নাম শোনা গেলেও হয়তো ক্যান্ডিডেট অমৃতা রায় হচ্ছেন।
তৃণমূলের তরফ থেকে একজন যুবনেতার নাম শোনা যাচ্ছে। কৌশানী মুখার্জীকে তৃণমূল এবার এখান থেকে প্রার্থী নাও করতে পারেন। এই বিধানসভায় বিজেপির জয়ের সম্ভাবনার ৭০-৩০ শতাংশ।
কৃষ্ণনগর দক্ষিণ বিধানসভায় জয়ের পার্থক্য হতে যাচ্ছে তৃণমূল বিজেপি ৫১-৪৯%।
২০২৬ শে এখানে তৃণমূলের প্রার্থী দৌড়ে রয়েছে রানিং বিধায়ক উজ্জ্বল বিশ্বাসের নাম। তবে আরেকজন যুব নেতার নাম শোনা যাচ্ছে। তিনিও দৌড়ে আছেন ।
বিজেপি প্রার্থী দৌড়ে প্রথমে যে নামটি উঠে এসেছে তিনি প্রদীপ ঘোষ। নদীয়া উত্তর জেলার সাধারণ সম্পাদক। দ্বিতীয় স্থানে থাকছেন মহাদেব সরকার। তিনি গতবারের প্রার্থী এবং রাজ্য কৃষান মোর্চার সভাপতি। তৃতীয় স্থানে যুব নেতা বিশ্বজিৎ সরকারের নাম ও শোনা যাচ্ছে।
নাকাশিপাড়া বিধানসভায় তৃণমূল বিজেপির জয়ের সম্ভাবনা ৫৫-৪৫%। SIR সঠিকভাবে হলে জয়ের মার্জিন আরো কমে যেতে পারে তৃণমূলের । তবে এখানে ত্রিমুখী লড়াই হলে বিজেপির জয়ের সম্ভাবনা প্রবল।
তৃণমূল এখানে কল্লোল খানকে প্রার্থী করতে পারে। যেহেতু তিনি রানিং এমএলএ। তবে আরো দু একজনের নাম আরো শোনা যাচ্ছে।
বিজেপি প্রার্থীর দৌড়ে আছেন, পঞ্চায়েত সমিতির বিরোধী দলনেতা শিক্ষক অনুপ কুমার মন্ডল এর নাম। তিনি দৌড়ে সবার উপরেই আছেন। এছাড়াও প্রার্থীর দৌড়েছেন গতবারের প্রার্থী শান্তনু দে।
এ ছাড়া নাম শোনা যাচ্ছে তপন রায়, দিনেশ বিশ্বাসেরও নামও।
রানাঘাট দক্ষিণ বিধানসভায় তৃণমূল বিজেপির জয়ের পার্থক্য হতে পারে ৫২-৪৮%। তবে বিজেপি এখানে জয়লাভ করার প্রবল সম্ভাবনা আছে।
তৃণমূল এখানে মুকুটমনি অধিকারী কে পুনরায় প্রার্থী করবেন।
রানাঘাট উত্তর-পূর্বে প্রার্থীর দৌড়ে যে নামটি উঠে আসছেন তিনি হলেন অশোক বিশ্বাস। যদিও রানিং বিধায়ক যিনি আছেন তাকেই হয়তো দল এখান থেকে টিকিট দেবেন সেক্ষেত্রে অসীম বিশ্বাসের প্রার্থী হওয়ার সম্ভাবনা প্রবল।
তৃণমূলের তরফ থেকে একজন মহিলা প্রার্থীর নাম শোনা যাচ্ছে তিনি প্রার্থী দৌড়ে প্রথমেই আছেন।।
রানাঘাট উত্তর-পশ্চিম বিধানসভায় প্রার্থীর দৌড়ে রানিং বিধায়ক পার্থসারথি চট্টোপাধ্যায়ের নামই আছে।
শান্তিপুরে প্রার্থী দৌড়ে আছেন জগন্নাথ সরকার ঘনিষ্ঠ একজন ব্যবসায়ীর নাম। নবদ্বীপ বিধানসভায় যিনি প্রার্থী ছিলেন তিনি হয়তো পুনরায় আবারো প্রার্থী হতে চলেছেন বিজেপির পক্ষ থেকে।
বিজেপি প্রার্থীর দৌড়ে এখানে প্রথমে যে নামটি সবার উপরে উঠে এসেছে তিনি অসিত বরণ মন্ডল। গতবার তিনি প্রার্থীর দৌড়েছিলেন। তিনি একজন সমাজসেবী পুরানো বিজেপি নেতা ও ব্যবসায়ী।
এছাড়া প্রবল ভাবে প্রার্থী দৌড়ে আছেন রাজ্য বিজেপি তপশিলি মোর্চার সভাপতি সুদীপ দাস এর নাম। তিনি ভারত সরকারের আম্বেদকর ফাউন্ডেশনের সদস্য। তিনি সদ্য এই বিধানসভায় নিজের ভোট স্থানান্তরিত করেছেন। তৃতীয় স্থানে নাম থাকছে সুকান্ত বিশ্বাস এর।
তেহট্ট বিধানসভায় তৃণমূল বিজেপির জয়ের পার্থক্য হতে যাচ্ছে ৫৫-৪৫%। তবে এই বিধানসভায় বিজেপির সঠিক প্রার্থী নির্বাচন করতে পারলে এবং SIR সঠিকভাবে হলে জয় পরাজয়ের গল্প অন্যরকম হতে যাচ্ছে.
তৃণমূল এখানে তাপস কুমার সাহা মৃত। এখানে দল কাকে প্রার্থী করতে পারে সেটা এখনো জানা যায়নি। তবে জেলা পরিষদের একজন সদস্যের নাম শোনা যাচ্ছে তিনি প্রার্থীর দৌড়ে আছেন।
বিজেপি প্রার্থী দৌড়ে প্রথমে যে নামটি উঠে আসছেন তিনি হলেন ডক্টর আমোদ প্রসাদ। তিনি সবার উপরের সারিতে থাকবেন।
এরপর প্রার্থীর দৌড়ে আছেন আশুতোষ পাল। তিনি প্রার্থী ছিলেন গতবার। প্রাক্তন শিক্ষক সমর কুমার বিশ্বাসের নামও শোনা যাচ্ছে।
এছাড়া এখানে প্রার্থী দৌড়ে আছেন মতুয়া আন্দোলনের মুখ অনিমেষ বালার নামও।
পলাশীপাড়া বিধানসভায় তৃণমূল- বিজেপি র জয়ের পার্থক্য হতে পারে ৫৬-৪৪%। এখানে বিজেপিকে জিততে গেলে কিছু জটিল অংক সমাধান করতে হবে বিজেপিকে।
মানিকবাবু হয়তো এখান থেকে ভোটে দাঁড়াবেন না বা দল তাকে প্রার্থী করবেন না হয়তো।
সেক্ষেত্রে শাসক দল তৃণমূলের হয়ে ভোটে দাঁড়াতে পারেন একজন শিক্ষক নেতা। তিনি হলেন দেবাশীষ বিশ্বাস ।
বিজেপির প্রার্থী হিসেবে প্রথমেই নাম উঠে এসেছে সংগীতা ঘোষের। তিনি মহিলা মোর্চার নেতৃত্ব।
এবং জেলার প্রাক্তন সহ-সভাপতি।
এরপরে প্রার্থী হিসেবে নাম উঠে আসছে গতবারের প্রার্থী বিভাস চন্দ্র মন্ডল এর। শারীরিক অসুস্থতার কারনে তাকে এবার দল প্রার্থী নাও করতে পারে।
এছাড়া একজন উকিলের নাম শোনা যাচ্ছে। তবে এই বিধানসভায় এবার মহিলা প্রার্থী হওয়ার সম্ভাবনা প্রবল কারণ কৃষ্ণনগর লোকসভার মধ্যে দুটো বিধানসভা তে মহিলা প্রার্থী করা হতে পারে বলে সূত্রের খবর।
কালিগঞ্জ বিধানসভায় বিজেপির জয়ের সম্ভাবনা নেই বললেই চলে। এখানে তৃণমূলের জয় সম্ভাবনা ৭০ শতাংশ। তৃণমূলের এখান থেকে প্রার্থী করতে পারেন উপ নির্বাচনে জয়ী আলিফা আহমেদকে।
আশিস ঘোষ কে এখান থেকে প্রার্থী নাও করা হতে পারে। তার কারণ তিনি উপনির্বাচনে প্রায় পঞ্চাশ হাজার ভোটে এখান থেকে পরাজয় স্বীকার করেছেন। উপ নির্বাচনে কোনরূপ প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারিনি তৃণমূলের বিরুদ্ধে।
বিজেপির পক্ষ থেকে এখানে কাউকেই এখনো সেভাবে আলোচনায় আনা হয়নি।
চাপড়া বিধানসভায় তৃণমূলের জয় সম্ভাবনা ৬০-৪০%। যদিও SIR এর প্রভাবে চাপরা বিধানসভায় তৃণমূলের অনেকটা ভোট কমে যেতে পারে। যদি ত্রিমুখী লড়াই হয় বিজেপি অনেক ভালো ফল করতে পারে। তৃণমূলের তরফ থেকে এখানে প্রার্থী হবেন এম এল এ রূপবানুর রহমান।
বিজেপি প্রার্থীর দৌড়ে আছেন গতবারের প্রার্থী কল্যাণ নন্দী। এরপরই নাম শোনা যাচ্ছে পরিতোষ সরকারের। জনমত সমীক্ষা ও সার্ভে রিপোর্টে পরিতোষ সরকার এবং কল্যাণ নন্দির মধ্যে জোরদার লড়াই চলছে। দুজনেই দীর্ঘদিনের বিজেপি নেতৃত্ব। কল্যাণ নন্দী প্রাক্তন সভাপতি
অপরিচিত সরকার পেশায় একজন প্রাইমারি শিক্ষক। এখন দেখার বিষয় দল কাকে প্রার্থী করে।
করিমপুর বিধানসভায় তৃণমূল-বিজেপি জয়ের পার্থক্য থাকতে পারে ৫৮-৪২%। করিমপুর বিধানসভায় সঠিকভাবে SIR হলে প্রায় ২০ থেকে ২৫ হাজার ভোট বাতিল হতে পারে। তাহলে তৃণমূলের জয়ের ব্যবধান অনেকটাই কমে গিয়ে বিজেপির সঙ্গে জোট টক্কর হতে পারে। তবে এখানেও প্রচুর পরিমাণে বুথে বিজেপির কর্মী থাকে না ভোটের দিন। বিজেপি এই কাজ করতে পারলে এই বিধানসভাতেও চোর লড়াই হওয়ার সম্ভাবনা আছে। এখানে শাসক দল তৃণমূল হয়তো পুনরায় বিমলেন্দু সিংহ রায় কে প্রার্থী করবে।
বিজেপি প্রার্থীদের দৌড়ে প্রথমেই আছেন মৃগেন কুমার বিশ্বাসের নাম। তারপরে থাকছেন ইন্দ্রজিৎ মন্ডলের নাম । এছাড়াও আছেন গতবারের প্রার্থী সমরেন্দ্রনাথ ঘোষের নাম।
তবে দেখার বিষয় দল কাদের প্রার্থী করে। সঠিক প্রার্থী নির্বাচন ও SIR সঠিকভাবে হলে এই বিধানসভাগুলিতে বিজেপির জয়ের দোরগোড়ায় পৌঁছে যাবে।
২০২৬ শে বিধানসভা নির্বাচনে পশ্চিমবঙ্গ কে চমকে দেবে নদীয়া জেলার রেজাল্ট।